বিডিএস জরিপ কী? কবে শুরু হবে এবং বিস্তারিত

আপনার হাতে থাকা জমির খতিয়ানটা কি একশো বছর আগের পুরনো রেকর্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? সিএস, এসএ, আরএস – এই একেকটা জরিপের মধ্যে দাগ নম্বর, মালিকের নাম বা জমির পরিমাণে গরমিল পেয়ে বিরক্ত হননি, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছে। এই গরমিলের কারণেই বছরের পর বছর মামলা চলে, ভাইয়ে-ভাইয়ে জমি নিয়ে ঝগড়া হয়, আর জমি কেনাবেচার সময় ভয়ে থাকতে হয়- না জানি কোন কাগজে গণ্ডগোল বেরিয়ে আসে।

ঠিক এই সমস্যার সমাধান করতেই সরকার শুরু করেছে বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS)। এই লেখায় একদম সহজ ভাষায় জানবেন- বিডিএস জরিপ আসলে কী, কেন এটা দরকার হলো, কোথা থেকে এর যাত্রা শুরু, কীভাবে কাজ করে, আর একজন জমির মালিক হিসেবে আপনার কী করণীয়। শেষ পর্যন্ত পড়লে বিডিএস নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন বাকি থাকবে না।

বিডিএস জরিপ কী

বিডিএস মানে বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (Bangladesh Digital Survey)। এটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি আধুনিক ভূমি জরিপ কার্যক্রম, যার মাধ্যমে সারাদেশের জমির সীমানা, মালিকানা, মৌজা ম্যাপ এবং খতিয়ান নতুন করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

আগে জরিপের কাজ হতো হাতে আঁকা ম্যাপ আর কাগজের রেকর্ডের মাধ্যমে। ফলে ভুল হওয়ার সুযোগ ছিল অনেক বেশি, আর একটা রেকর্ড খুঁজে বের করতেও সময় লাগত অনেক। বিডিএস জরিপে সেই জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন, জিএনএসএস (GNSS), জিআইএস (GIS) এবং টোটাল স্টেশনের মতো প্রযুক্তি। এতে জমির মাপ যেমন নির্ভুল হচ্ছে, তেমনি পুরো তথ্য থাকছে ডিজিটাল ফরম্যাটে, যা ভবিষ্যতে অনলাইনেই যাচাই করা যাবে।

সহজ কথায় বললে, বিডিএস হলো দেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে আধুনিক ভূমি জরিপ, যেখানে দেশের প্রতিটি জমির একটা নির্ভুল, হালনাগাদ এবং ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

বিডিএস জরিপ কেন শুরু করা হলো

বাংলাদেশে জমির প্রথম জরিপ হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, ১৮৮৮ সালে কক্সবাজারের রামু থেকে, যার নাম ছিল সিএস জরিপ। এরপর ধাপে ধাপে হয়েছে আরএস, এসএ, পিএস এবং সবশেষে বিএস জরিপ। কিন্তু এত জরিপের পরও জমির জটিলতা কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। এর পেছনে কয়েকটা কারণ রয়েছে-

  • একেক জরিপে জমির দাগ নম্বর বা মালিকের নাম একেক রকম থাকা
  • অনেক এলাকায় আরএস জরিপ সম্পন্নই না হওয়া
  • হাতে আঁকা পুরনো ম্যাপে মাপে ভুল থাকা
  • রেকর্ড হালনাগাদ না থাকায় প্রকৃত মালিক শনাক্ত করতে সমস্যা হওয়া

এই সমস্যাগুলোই বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বেশিরভাগ মামলা-মোকদ্দমা আর বিরোধের মূল কারণ। এই জট খুলতে এবং একবারে নির্ভুল একটা ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করতেই সরকার হাতে নিয়েছে বিডিএস জরিপ। এর মূল লক্ষ্য হলো-

  • জমির প্রকৃত মালিকানা সহজে নির্ধারণ করা
  • ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
  • ভবিষ্যতে জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো
  • খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ অনলাইনে সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা করা

বিডিএস জরিপ কোথা থেকে এবং কবে শুরু হয়েছে

বিডিএস জরিপের যাত্রা একদিনে শুরু হয়নি, হয়েছে ধাপে ধাপে।

পাইলট কার্যক্রম: ২০২২ সালের ৩ আগস্ট পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) বিডিএস জরিপের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার ১৪টি উপজেলাকে এই পাইলটের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ এই এলাকাগুলোতে এসএ জরিপের পর আরএস জরিপ সম্পন্নই হয়নি।

পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম: পাইলট সফল হওয়ার পর ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রামের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) থেকে সারাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে বিডিএস জরিপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় এই জরিপ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এই পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (DLRS), “Establishment of Digital Land Management System (EDLMS)” প্রকল্পের আওতায়। এখন বিভিন্ন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক জরিপের কাজ চলমান রয়েছে।

বিডিএস জরিপ কীভাবে কাজ করে

বিডিএস জরিপকে আলাদা করে তুলেছে এর প্রযুক্তি। পুরনো জরিপে যেখানে হাতে মাপ নিয়ে কাগজে ম্যাপ আঁকা হতো, সেখানে বিডিএসে ব্যবহার করা হচ্ছে-

  • ড্রোন সার্ভে – আকাশ থেকে জমির নিখুঁত ছবি ও মাপ সংগ্রহের জন্য
  • জিএনএসএস (GNSS/GPS) – জমির অবস্থান নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার জন্য
  • টোটাল স্টেশন – মাটিতে সরাসরি নির্ভুল মাপ নেওয়ার জন্য
  • জিআইএস (GIS) – সব তথ্য একসাথে মানচিত্রে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের জন্য

এই প্রযুক্তির সমন্বয়ে জমির সীমানা, দাগ, এবং মালিকানার তথ্য একসাথে সংগ্রহ করে সরাসরি ডিজিটাল ডেটাবেজে রাখা হয়। এতে মানুষের হাতে মাপার সময় যে ছোটখাটো ভুল হতো, তা অনেকাংশে কমে আসে।

বিডিএস জরিপের ধাপসমূহ

বিডিএস জরিপ একবারে শেষ হয় না, বরং কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়-

  1. বিজ্ঞপ্তি প্রচার – জরিপ শুরুর আগে মাইকিং ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এলাকাবাসীকে জানানো হয়
  2. মাঠ জরিপ (কিস্তোয়ার) – সরেজমিনে গিয়ে জমির সীমানা মাপা ও চিহ্নিত করা হয়
  3. খানাপুরি-কাম-বুঝারত – মাঠের তথ্যের ভিত্তিতে খসড়া রেকর্ড ও ম্যাপ তৈরি করা হয়
  4. খসড়া প্রকাশ – তৈরি হওয়া খসড়া খতিয়ান ও ম্যাপ জনসাধারণের দেখার জন্য প্রকাশ করা হয়
  5. আপত্তি ও আপিল – খসড়ায় ভুল থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপত্তি ও পরে প্রয়োজনে আপিল করা যায়
  6. চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ – সব আপত্তি নিষ্পত্তির পর জমির চূড়ান্ত রেকর্ড গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়

বিডিএস জরিপে জমির মালিকের করণীয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

জরিপের সময় ভোগান্তি এড়াতে হাতের কাছে রাখা ভালো-

  • জমির দলিলের সার্টিফাইড কপি বা মূল দলিল
  • আগের এসএ বা আরএস খতিয়ানের কপি
  • সর্বশেষ খাজনা পরিশোধের রশিদ বা চালান
  • জমি নিয়ে কোনো মামলা থাকলে তার আদালতের রায় বা আপিলের কাগজ
  • ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হলে ওয়ারিশ সনদ ও নামজারির কাগজপত্র

আরও কয়েকটা কাজ আগেভাগে সেরে রাখলে জরিপের সময় ঝামেলা অনেক কমে যায়-

  • নামজারি এখনো বাকি থাকলে তা সম্পন্ন করে রাখুন
  • ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা বকেয়া থাকলে তা পরিশোধ করে নিন
  • জরিপের নোটিশ নিয়মিত খেয়াল রাখুন এবং মাঠ জরিপের সময় সম্ভব হলে উপস্থিত থাকুন
  • খসড়া খতিয়ান প্রকাশ হলে অবশ্যই যাচাই করুন
  • ভুল পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আপত্তি জানান, দেরি করলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে

আপনার নামজারি এখনো সম্পন্ন না হয়ে থাকলে নামজারি আবেদন করার নিয়ম পোস্টটি দেখে নিতে পারেন। আর জমির খাজনা বাকি আছে কিনা জানতে চাইলে দেখুন জমির খাজনা বাকি আছে কিনা চেক করার নিয়ম

বিডিএস জরিপে জমির মালিকানা যাচাই করবেন কীভাবে

জরিপের কাজ শেষ হওয়ার পর নতুন খতিয়ান আসতে সময় লাগে। ততদিন পর্যন্ত আপনার আগের খতিয়ান দিয়ে মালিকানার তথ্য যাচাই করতে পারবেন। আপনার এলাকার জরিপ অনুযায়ী নিচের যেকোনো পোস্ট আপনার কাজে লাগতে পারে-

এছাড়া দাগ নম্বর বা নাম দিয়ে জমির মালিকানা যাচাই করতে চাইলে দেখুন দাগ ও নাম দিয়ে জমির মালিকানা যাচাই এবং জমির দলিল অনলাইনে আছে কিনা যাচাই করতে অনলাইনে জমির দলিল চেক করার নিয়ম পোস্টটি সাহায্য করবে।

বিডিএস জরিপের সুবিধা

বিডিএস জরিপ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে সাধারণ মানুষ যেসব সুবিধা পাবে-

  • জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ সহজ হবে
  • একই জমির একাধিক দাবি বা রেকর্ডের গরমিল কমে আসবে
  • জমি কেনাবেচার সময় ঝুঁকি কমবে
  • ওয়ারিশ সূত্রে রেকর্ড হালনাগাদ করা সহজ হবে
  • খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ ঘরে বসেই অনলাইনে পাওয়া যাবে
  • ভূমি অফিসের সেবা আরও দ্রুত ও ডিজিটাল হবে

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বিডিএস জরিপ কী?

বিডিএস বা বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে হলো ড্রোন, জিএনএসএস ও জিআইএসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাদেশের জমির সীমানা, মালিকানা এবং খতিয়ান নতুন করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি করার একটি সরকারি জরিপ কার্যক্রম।

বিডিএস জরিপ কেন করা হচ্ছে?

পুরনো সিএস, এসএ, আরএস জরিপের মধ্যে থাকা গরমিল, অসম্পূর্ণ রেকর্ড ও ভূমি বিরোধ কমিয়ে একটি নির্ভুল ও হালনাগাদ ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড তৈরির জন্য এই জরিপ শুরু করা হয়েছে।

বিডিএস জরিপ কবে ও কোথা থেকে শুরু হয়েছে?

২০২২ সালের ৩ আগস্ট পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে পাইলটিং শুরু হয়। এর সাফল্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে বিডিএস জরিপ চালু করা হয়।

বিডিএস জরিপে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন হয়?

জমির দলিলের কপি, আগের এসএ বা আরএস খতিয়ানের কপি, খাজনা পরিশোধের রশিদ এবং জমি নিয়ে মামলা থাকলে সংশ্লিষ্ট আদালতের কাগজপত্র প্রয়োজন হয়।

বিডিএস জরিপে আপত্তি জানানোর নিয়ম কী?

খসড়া খতিয়ান প্রকাশের পর কোনো ভুল পেলে প্রজাস্বত্ব বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি জানাতে হয়। প্রয়োজনে পরবর্তীতে আপিলও করা যায়।

বিডিএস জরিপ কি পুরো দেশে একসাথে হচ্ছে?

না, ধাপে ধাপে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক এই জরিপ চলছে। পাইলট পটুয়াখালীতে এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়ার পর এখন ধীরে ধীরে অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিডিএস আর আরএস বা বিএস জরিপের মধ্যে পার্থক্য কী?

আরএস, বিএস এসব জরিপ হয়েছিল মূলত হাতে মাপ নিয়ে ও কাগজে ম্যাপ এঁকে। বিডিএস জরিপে ড্রোন, জিএনএসএস ও টোটাল স্টেশনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো তথ্য শুরু থেকেই ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা হয়।

বিডিএস খতিয়ান অনলাইনে কীভাবে যাচাই করব?

বিডিএস জরিপ শেষ হয়ে নতুন খতিয়ান তৈরি হওয়ার পর তা সরকারি ওয়েবসাইটে অনলাইনে যাচাই করা যাবে। ততদিন আপনার এলাকার সর্বশেষ জরিপ (যেমন আরএস বা বিএস) অনুযায়ী খতিয়ান যাচাই করে নিতে পারেন।

শেষ কথা

বিডিএস জরিপ একদিনে শেষ হওয়ার মতো কাজ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য দেশের প্রতিটি জমির জন্য একটি নির্ভুল ও ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করা। আপনার এলাকায় জরিপের নোটিশ এলে ভয় না পেয়ে বরং কাগজপত্র ঠিক রেখে সচেতনভাবে অংশ নিন- এতে ভবিষ্যতে আপনার জমি নিয়ে ঝামেলার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

জমির খতিয়ান, দলিল বা মৌজা ম্যাপ সংক্রান্ত আরও তথ্য পেতে ঘুরে আসুন আমাদের FAQ পেজ থেকে।

অন্যান্য পোস্টগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *