আপনার জমি কি ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায়? তাহলে আপনার জমির মালিকানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো সিটি জরিপ খতিয়ান।
অনেকেই জানেন না যে এই একটি কাগজেই আটকে যেতে পারে জমি কেনাবেচা, ব্যাংক লোন কিংবা নামজারির পুরো প্রক্রিয়া। ভুল তথ্য বা পুরনো ধারণা নিয়ে এগোলে পরে মাসের পর মাস অফিসে দৌড়াতে হতে পারে। তাই সিটি জরিপ আসলে কী, এটি কবে হয়েছে, কীভাবে এর খতিয়ান-পর্চা হাতে পাবেন এবং ভুল থাকলে কীভাবে ঠিক করবেন—সবকিছু এই লেখায় সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে বোঝানো হলো।
সিটি জরিপ কি
সিটি জরিপ হলো বাংলাদেশের বড় শহর ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার জমির জন্য পরিচালিত একটি ভূমি জরিপ। একে অনেক সময় মহানগর জরিপও বলা হয়। আর.এস জরিপের পর যখন কোনো এলাকা শহরে রূপান্তরিত হয় বা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আসে, তখন সেই এলাকার জমি নতুন করে মেপে, মালিকানা যাচাই করে নতুন নকশা ও খতিয়ান তৈরি করা হয়—এই পুরো কাজটিই সিটি জরিপ।
সহজভাবে বললে, গ্রামের জমির জন্য যেমন সিএস, এসএ, আরএস, বিএস জরিপ হয়, ঠিক তেমনি শহরের জমির জন্য হয় সিটি জরিপ। এই জরিপের মাধ্যমে তৈরি হওয়া খতিয়ানকেই বলা হয় সিটি খতিয়ান।
সিটি জরিপ কত সালে হয়
সিটি জরিপের কাজ একবারে সব এলাকায় হয়নি। আর.এস জরিপ শেষ হওয়ার পর সরকার ধাপে ধাপে বিভিন্ন শহর এলাকায় এই জরিপ শুরু করে। মূলত রাজধানী ঢাকা এবং কয়েকটি বড় শহরকে কেন্দ্র করে সিটি জরিপ পরিচালিত হয়েছে, আর এখনো দেশের কিছু এলাকায় এই কাজ চলমান রয়েছে।
তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট সাল বলে দেওয়া যায় না—এলাকাভেদে জরিপের সময়কাল আলাদা। আপনার জমির জরিপ ঠিক কোন সালে সম্পন্ন হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে হলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস বা অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান করে দেখাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
সিটি জরিপ বনাম অন্যান্য জরিপ
কোন জরিপ কখন হয়েছে এবং কোন এলাকার জন্য প্রযোজ্য, তা এক নজরে দেখে নিন—
| জরিপের নাম | পরিচিতি | প্রযোজ্য এলাকা |
|---|---|---|
| সিএস | সবচেয়ে পুরনো জরিপ | সারা দেশ |
| এসএ | পাকিস্তান আমলের জরিপ | সারা দেশ |
| আরএস | সংশোধিত জরিপ | সারা দেশ |
| সিটি জরিপ | মহানগর জরিপ | শহর ও সিটি কর্পোরেশন এলাকা |
| বিএস | সর্বশেষ চলমান জরিপ | নির্দিষ্ট এলাকা |
| বিআরএস | সংশোধনী জরিপ | নির্দিষ্ট এলাকা |
সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ান নিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন—সি এস খতিয়ান যাচাই, এস এ খতিয়ান যাচাই এবং আর এস খতিয়ান যাচাই। আর বিএস ও বিআরএস খতিয়ান সম্পর্কে জানতে পড়ুন—বি এস খতিয়ান যাচাই ও বি আর এস খতিয়ান যাচাই।
সিটি জরিপ খতিয়ান কি
সিটি জরিপ চলাকালে প্রতিটি জমির মালিক, দখলদার, জমির পরিমাণ, শ্রেণি ও অবস্থান যাচাই করে যে সরকারি রেকর্ড তৈরি হয়, সেটিই সিটি জরিপ খতিয়ান। এতে যা যা থাকে—
- জমির মালিকের নাম ও ঠিকানা
- পিতা বা স্বামীর নাম
- দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ
- জমির শ্রেণি (নাল, ভিটি, বাড়ি ইত্যাদি)
- খতিয়ান নম্বর ও মৌজার নাম
এই খতিয়ান জমির মালিকানার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়, তাই জমি কেনার আগে সিটি জরিপ খতিয়ান যাচাই করে নেওয়া খুবই জরুরি।
সিটি জরিপ পর্চা কি এবং কীভাবে চিনবেন
পর্চা আর খতিয়ান মূলত একই জিনিস—দুটি শব্দই জমির মালিকানার সরকারি হিসাব বোঝাতে ব্যবহার হয়। এলাকাভেদে শুধু নামের পার্থক্য হয়। সিটি জরিপের পর্চা চেনার একটি সহজ উপায় হলো—
- উপরে খতিয়ান নম্বর লেখা থাকে
- সিটি জরিপের নির্দিষ্ট সিল মারা থাকে
- এটি সাধারণত এক পাতার আড়াআড়ি (ল্যান্ডস্কেপ) ফরম্যাটে ছাপা হয়
সন্দেহ হলে পর্চার ভলিয়াম নম্বর সেটেলমেন্ট অফিসে গিয়ে মিলিয়ে দেখতে পারেন। এতে বোঝা যাবে পর্চাটি আসল নাকি জাল।
সিটি জরিপ খতিয়ান/পর্চা পাওয়ার উপায়
সিটি জরিপ খতিয়ান এখন ঘরে বসেই অনলাইনে বের করা যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো—
অনলাইনে পাওয়ার নিয়ম
- প্রথমে dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে যান।
- মেনু থেকে “সার্ভে খতিয়ান” অপশনটি বেছে নিন।
- বিভাগ, জেলা, উপজেলা/থানা নির্বাচন করুন।
- খতিয়ানের ধরন থেকে “সিটি জরিপ” বা “সিটি খতিয়ান” নির্বাচন করুন।
- মৌজা বা জে.এল নম্বর দিন এবং খুঁজুন বাটনে ক্লিক করুন।
- তালিকা থেকে আপনার খতিয়ান নম্বর বা মালিকের নাম দেখে সেটিতে দুইবার ক্লিক করুন।
- খতিয়ানের বিস্তারিত তথ্য দেখা গেলে সেখান থেকেই অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজতে চাইলে “অধিকতর অনুসন্ধান” অপশনটি ব্যবহার করুন। এই একই পদ্ধতিতে নামজারি খতিয়ানও বের করা যায়—বিস্তারিত জানতে দেখুন নামজারি খতিয়ান অনুসন্ধান পোস্টটি।
অফলাইনে পাওয়ার নিয়ম
যাদের অনলাইনে খতিয়ান পেতে সমস্যা হয়, তারা সরাসরি সংশ্লিষ্ট এলাকার সেটেলমেন্ট অফিস বা ভূমি অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারেন। প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়া যায়।
খতিয়ান খুঁজে না পেলে কী করবেন
ভূমি মন্ত্রণালয় ধীরে ধীরে সব এলাকার জমির তথ্য অনলাইনে যুক্ত করছে, তাই কার্যক্রমটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনলাইনে আপনার খতিয়ান খুঁজে না পেলে স্থানীয় ভূমি অফিস বা সেটেলমেন্ট অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করাই ভালো সমাধান।
সিটি জরিপ খতিয়ান বা মৌজা ম্যাপের ফি কত
- খতিয়ানের অনলাইন কপি বা কিউআর কোডযুক্ত তাৎক্ষণিক কপির জন্য ফি লাগে ১২০ টাকা।
- সার্টিফাইড বা সত্যায়িত খতিয়ান কপির জন্যও ফি ১২০ টাকা।
- মৌজা ম্যাপ ডাকযোগে সংগ্রহ করতে চাইলে ফি লাগে ৬৩০ টাকা।
মৌজা ম্যাপ কীভাবে দেখবেন ও সংগ্রহ করবেন, তা বিস্তারিত জানতে পড়ুন—মৌজা ম্যাপ অনুসন্ধান।
সিটি জরিপ সংশোধন করার নিয়ম
সিটি জরিপ খতিয়ানে নাম, দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণে ভুল থাকতে পারে। ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধনের পদ্ধতিও আলাদা হয়।
করণিক বা ছোট ভুলের ক্ষেত্রে
বানান ভুল, ছোট টাইপিং মিসটেক বা সহজ কোনো ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে মিসকেস করে তা সংশোধন করা যায়। এক্ষেত্রে যা যা লাগে—
- সর্বশেষ খতিয়ানের সত্যায়িত কপি
- সংশ্লিষ্ট মৌজার ম্যাপ
- ওয়ারিশ সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- মূল দলিলের ফটোকপি
- ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ
আবেদন জমা দেওয়ার পর ইউনিয়ন ভূমি অফিস তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠায়, এরপর সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নোটিশ দিয়ে শুনানি শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংশোধনের আদেশ দেন।
বড় ধরনের ভুল বা মালিকানা জটিলতার ক্ষেত্রে
মালিকানা নিয়ে জটিলতা বা বড় ধরনের ভুল থাকলে তা সহজে ভূমি অফিসে সমাধান হয় না। এক্ষেত্রে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হয়। মনে রাখা জরুরি—
- চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশের ১ বছরের মধ্যে সংশোধনী মামলা করতে হয়
- বিশেষ পরিস্থিতিতে এই মেয়াদ আরও ১ বছর বাড়ানো যেতে পারে
- এই মামলা একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে করাই ভালো
দলিল বা খতিয়ান নিয়ে আরও কোনো সন্দেহ থাকলে জমির মালিকানা যাচাই করে নিতে পারেন—দাগ নাম্বার দিয়ে জমির মালিকানা চেক এবং অনলাইনে জমির দলিল চেক পোস্ট দুটো দেখে নিন।
জমি কেনার আগে সিটি জরিপ খতিয়ান কেন যাচাই জরুরি
জমি কেনার সময় শুধু দলিল দেখলেই হয় না, খতিয়ানও মিলিয়ে দেখতে হয়। কারণ—
- দলিলের সাথে খতিয়ানের তথ্য না মিললে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে জটিলতা হতে পারে
- নামজারি করার সময় সঠিক খতিয়ান না থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে
- ব্যাংক লোনের জন্যও হালনাগাদ খতিয়ান প্রয়োজন হয়
জমির পরিমাণ শতাংশ বা কাঠায় হিসাব করতে চাইলে ব্যবহার করতে পারেন আমাদের জমির ক্যালকুলেটর।
প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সিটি জরিপ ও বিএস জরিপ কি একই জিনিস?
না, তবে দুটি কাছাকাছি ধরনের জরিপ। সিটি জরিপ শহর ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য হয়, আর বিএস জরিপ দেশের অন্যান্য নির্দিষ্ট এলাকার জন্য চলমান রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দুটি নামই কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার হতে দেখা যায়।
সিটি জরিপ খতিয়ান অনলাইনে বের করতে কী কী লাগে?
বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজার নাম এবং খতিয়ান নম্বর বা মালিকের নাম জানা থাকলেই dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে সহজে খতিয়ান খুঁজে বের করা যায়।
সিটি জরিপ পর্চা আর নামজারি খতিয়ান কি এক?
না। সিটি জরিপ পর্চা হলো সরকারি জরিপের মাধ্যমে তৈরি মূল খতিয়ান, আর নামজারি খতিয়ান তৈরি হয় জমি হাতবদল বা মালিকানা পরিবর্তনের পর। নামজারি খতিয়ান সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন—নামজারি আবেদন করার নিয়ম।
সিটি জরিপ খতিয়ানে ভুল থাকলে কতদিনের মধ্যে সংশোধন করতে হয়?
চূড়ান্ত প্রকাশের ১ বছরের মধ্যে সংশোধনী মামলা করা উচিত, প্রয়োজনে আরও ১ বছর সময় বাড়ানো যায়।
সিটি জরিপ খতিয়ান না পেলে কী করব?
এলাকাভিত্তিক তথ্য অনলাইনে আনার কাজ এখনো চলমান, তাই খতিয়ান অনলাইনে না পেলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট বা ভূমি অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করুন।
খতিয়ানের অনলাইন কপি পেতে কত টাকা লাগে?
কিউআর কোডসহ অনলাইন কপি বা সার্টিফাইড কপির জন্য ফি ১২০ টাকা।
আরও প্রশ্ন-উত্তর জানতে ভিজিট করুন আমাদের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) পেজ।
শেষ কথা
সিটি জরিপ খতিয়ান জমির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, তাই এটি নিয়ে অস্পষ্ট ধারণা রাখা ঠিক নয়। জমি কেনার আগে হোক বা নামজারির প্রস্তুতির সময়—সিটি জরিপ খতিয়ান ও পর্চা যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। খতিয়ানে কোনো ভুল পেলে দেরি না করে সঠিক প্রক্রিয়ায় সংশোধনের আবেদন করুন, কারণ সময়সীমা পার হয়ে গেলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।





