হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম | অনলাইনে হোল্ডিং নাম্বার দেখুন

জমি বা বাড়ির খাজনা দিতে গেলে, ভূমি কর পরিশোধ করতে গেলে বা NID করার সময় প্রায় সবাইকে একটা প্রশ্নের সামনে পড়তে হয় — হোল্ডিং নাম্বার কত? অনেকেই জানেন না এই নাম্বার আসলে কী, আর কোথা থেকে বের করতে হয়।

এই পোস্টে হোল্ডিং নাম্বার কী, কেন লাগে এবং ঘরে বসে অনলাইনে বা ভূমি অফিসে গিয়ে অফলাইনে কীভাবে হোল্ডিং নাম্বার বের করবেন — সবকিছু সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে দেখানো হলো।

হোল্ডিং নাম্বার কি?

হোল্ডিং নাম্বার হলো ইউনিয়ন ভূমি অফিস, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের রেজিস্টার বইয়ে থাকা একটি সিরিয়াল নাম্বার। প্রতিটি জমি বা বাড়ির আলাদা মালিকানা চিহ্নিত করার জন্য এই নাম্বার দেওয়া হয়।

সহজভাবে বললে — আপনার জমি বা বাড়ির নাম, ঠিকানা এবং মালিকানার তথ্য ভূমি অফিসের বইয়ে যত নম্বর পাতায় বা ক্রমিকে লেখা আছে, সেটাই হোল্ডিং নাম্বার। এই নাম্বার দিয়েই প্রতি বছর জমির খাজনা বা বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে রাখা ভালো:

  • অনেক সময় খতিয়ান নাম্বার আর হোল্ডিং নাম্বার একই হয়ে থাকে, বিশেষ করে রেকর্ডীয় খতিয়ানের ক্ষেত্রে।
  • নামজারি বা খারিজ খতিয়ানের হোল্ডিং নাম্বার সাধারণত ভিন্ন হয়।
  • একজন ব্যক্তির নামে যতগুলো খতিয়ান থাকবে, তার হোল্ডিং নাম্বারও ততগুলোই থাকবে।
  • গ্রামের জমির হোল্ডিং নাম্বার দেওয়া হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে, আর শহরের বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার দেওয়া হয় পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে।

হোল্ডিং নাম্বার কেন গুরুত্বপূর্ণ

হোল্ডিং নাম্বার ছাড়া নিচের কাজগুলো করা কঠিন হয়ে যায়:

  • জমির বাৎসরিক খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) পরিশোধ করা
  • বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স জমা দেওয়া
  • জমি বা বাড়ির মালিকানা প্রমাণ করা
  • NID কার্ডে ঠিকানা যাচাই করা
  • জমি নামজারি বা খারিজ করার সময় তথ্য মিলিয়ে দেখা
  • ব্যাংক লোন বা জমি বিক্রির সময় কাগজপত্র যাচাই করা

তাই জমি বা বাড়ি কেনার পর সবার আগে হোল্ডিং নাম্বার জেনে নেওয়া উচিত।

হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম

আপনি হোল্ডিং নাম্বার দুইভাবে বের করতে পারবেন — অনলাইনে ঘরে বসে, আবার সরাসরি অফিসে গিয়ে অফলাইনে। জমি হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট আর বাড়ি হলে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে কাজটি করতে হয়। নিচে সবগুলো নিয়ম আলাদা করে দেখানো হলো।

জমির হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম

জমির হোল্ডিং নাম্বার বের করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের land.gov.bd বা ldtax.gov.bd ওয়েবসাইট। ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  1. প্রথমে মোবাইল অথবা কম্পিউটার থেকে https://ldtax.gov.bd বা https://land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
  2. রেজিস্ট্রেশনের জন্য আপনার মোবাইল নাম্বার, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নাম্বার ও জন্মতারিখ দিন।
  3. আপনার মোবাইলে ৬ ডিজিটের একটি OTP কোড আসবে। কোডটি লিখে যাচাই করুন। এতে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবে।
  4. এবার একটি পাসওয়ার্ড সেট করে আপনার আইডিতে লগইন করুন।
  5. প্রোফাইলে গিয়ে খতিয়ান অপশনে ক্লিক করে জমির খতিয়ানের তথ্য (বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নাম্বার) যুক্ত করুন। প্রয়োজনে খতিয়ান বা পর্চার কপি আপলোড করুন।
  6. তথ্য জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা তহশিলদার আপনার কাগজপত্র যাচাই করবেন।
  7. যাচাই ও অনুমোদন সম্পন্ন হলে আপনার হোল্ডিং নাম্বার প্রোফাইলে এন্ট্রি হয়ে যাবে এবং আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নাম্বারে জানিয়ে দেওয়া হবে।
  8. এরপর প্রোফাইলের হোল্ডিং অপশনে ক্লিক করলেই আপনার হোল্ডিং নাম্বার ও বকেয়া খাজনার তথ্য দেখতে পাবেন।

সাধারণত অনুমোদনের জন্য কিছুদিন সময় লাগে, কারণ ভূমি অফিস আপনার আপলোড করা রশিদ বা খতিয়ান যাচাই করে তারপর অনুমোদন দেয়।

Eporcha GOV BD এর সকল সেবা dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে।

খতিয়ান থেকে হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম

অনেকের হাতে খতিয়ানের কপি থাকে কিন্তু হোল্ডিং নাম্বার জানা থাকে না। এক্ষেত্রে করণীয়:

  1. খতিয়ানের কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মৌজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান।
  2. অফিসের রেজিস্টার বই বা ভলিউমে আপনার খতিয়ান নাম্বার দিয়ে খুঁজলে সেই খতিয়ানের বিপরীতে হোল্ডিং নাম্বার লেখা পাবেন।
  3. অনলাইনেও একইভাবে https://ldtax.gov.bd তে প্রোফাইলে খতিয়ান নাম্বার যুক্ত করে দিলে, ভূমি অফিস যাচাই করে হোল্ডিং নাম্বার বসিয়ে দেয়।
  4. রেকর্ডীয় খতিয়ানের ক্ষেত্রে খতিয়ান নাম্বার ও হোল্ডিং নাম্বার একই হতে পারে, কিন্তু নামজারি খতিয়ানের হোল্ডিং নাম্বার সাধারণত আলাদা হয়ে থাকে। তাই দুটো নাম্বার এক ধরে নেওয়ার আগে অফিসে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।

বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম

শহরের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের হোল্ডিং নাম্বার আসে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে, ভূমি অফিস থেকে নয়। এটি বের করার নিয়ম:

  1. বাড়ির দেয়ালে বা গেটে লাগানো নাম্বার প্লেটে হোল্ডিং নাম্বার লেখা থাকে। প্রথমে সেটি খুঁজে দেখুন।
  2. প্লেট না থাকলে বা নাম্বার অস্পষ্ট হলে, সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন (যেমন ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ) বা পৌরসভার ওয়েবসাইটে গিয়ে হোল্ডিং ট্যাক্স সেবা অপশন খুঁজুন।
  3. পুরনো হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ থাকলে সেখানেও হোল্ডিং নাম্বার লেখা থাকে।
  4. কোনো তথ্য না পেলে সরাসরি আপনার এলাকার আঞ্চলিক (রিজিওনাল) কার্যালয় বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে বাড়ির দলিল বা নামজারির কাগজ দেখিয়ে হোল্ডিং নাম্বার জেনে নিতে পারবেন।

৪. অফলাইনে হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম

অনলাইনে সমস্যা হলে বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত না হলে সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজটি করতে পারেন:

  1. জমির জন্য নিকটস্থ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। বাড়ির জন্য পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল অফিসে যান।
  2. সাথে খতিয়ানের কপি, আগের খাজনার রশিদ বা নামজারির কাগজ নিয়ে যান।
  3. অফিসের হেল্প ডেস্কে কাগজপত্র দেখালে তারা মৌজার রেজিস্টার বই দেখে হোল্ডিং নাম্বার বলে দেবে।
  4. প্রথমবার অফিসে গিয়ে অনলাইন খাজনা রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিলে অফিস থেকেই আপনাকে মোবাইল নাম্বার দিয়ে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড তৈরি করে দেবে, যাতে পরের বার ঘরে বসেই কাজ করতে পারেন।

৫. কল সেন্টারের মাধ্যমে হোল্ডিং নাম্বার জানার নিয়ম

ইন্টারনেট বা অফিসে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টারেও ফোন করে সাহায্য নেওয়া যায়:

  1. ১৬১২২ বা ৩৩৩ নাম্বারে কল করুন।
  2. আপনার NID নাম্বার, জন্মতারিখ ও জমির তথ্য (মৌজা, খতিয়ান নাম্বার) জানিয়ে দিন।
  3. সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আপনার তথ্য যাচাই করে হোল্ডিং নাম্বার জানাতে সহায়তা করবেন।
  4. চাইলে নিকটস্থ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) থেকেও একইভাবে রেজিস্ট্রেশন ও হোল্ডিং নাম্বার সংগ্রহ করা যায়।

হোল্ডিং নাম্বার না থাকলে কী করবেন

নতুন জমি বা বাড়ি কেনার পর অনেক সময় হোল্ডিং নাম্বার এখনো তৈরি হয়নি এমন হতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন হোল্ডিং নাম্বারের জন্য আবেদন করতে হয়। আবেদনের সাথে সাধারণত নিচের কাগজপত্র প্রয়োজন হয়:

  • রেকর্ডীয় বা খারিজ খতিয়ানের কপি
  • জমি বা বাড়ির মালিকানার দলিল
  • আগের খাজনা বা ট্যাক্সের রশিদ (থাকলে)
  • ডিসিআর ও নামজারির কাগজ
  • রাজউকের প্লট হলে রাজউকের নামজারিপত্র
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি
  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি

এই কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে আবেদন জমা দিলে তারা যাচাই করে নতুন হোল্ডিং নাম্বার তৈরি করে দেয়। এই সেবা নেওয়ার জন্য সাধারণত কোনো ফি লাগে না।

হোল্ডিং নাম্বার দিয়ে খাজনা বা ট্যাক্স পরিশোধ

হোল্ডিং নাম্বার পাওয়ার পর সেটি দিয়ে ঘরে বসেই খাজনা বা ট্যাক্স পরিশোধ করা যায়:

  1. ldtax.gov.bd তে লগইন করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা নির্বাচন করে হোল্ডিং নাম্বার দিন।
  2. বকেয়া বা চলতি বছরের খাজনার পরিমাণ দেখতে পাবেন।
  3. বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
  4. পেমেন্টের পর অনলাইন দাখিলা (রশিদ) ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন। এটি জমির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হোল্ডিং নাম্বার কি এনআইডি নাম্বারের সাথে সম্পর্কিত?

না, হোল্ডিং নাম্বার আলাদা একটি নাম্বার। তবে হোল্ডিং নাম্বার বসাতে NID নাম্বার লাগে, কারণ তা দিয়ে মালিকের পরিচয় যাচাই করা হয়।

খতিয়ান নাম্বার আর হোল্ডিং নাম্বার একই কি না?

কখনো কখনো এক হয়, বিশেষ করে রেকর্ডীয় খতিয়ানে। কিন্তু নামজারি খতিয়ানের ক্ষেত্রে এই দুটি নাম্বার আলাদা হতে পারে।

হোল্ডিং নাম্বার ছাড়া কি খাজনা দেওয়া যায়?

না, খাজনা বা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের জন্য হোল্ডিং নাম্বার লাগবেই। নাম্বার না থাকলে আগে নতুন হোল্ডিং নাম্বারের জন্য আবেদন করতে হবে।

গ্রামের জমি আর শহরের বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার কি একই জায়গা থেকে পাওয়া যায়?

না। গ্রামের জমির হোল্ডিং নাম্বার ইউনিয়ন ভূমি অফিস দেয়, আর শহরের বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন দেয়।

হোল্ডিং নাম্বার বের করতে কত সময় লাগে?

অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়ার পর ভূমি অফিসের যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হতে সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

শেষ কথা

হোল্ডিং নাম্বার জমি বা বাড়ির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। এটি ছাড়া খাজনা বা ট্যাক্স পরিশোধ করা যায় না, আর মালিকানার প্রমাণও ঠিকভাবে দেখানো যায় না। জমির জন্য land.gov.bd বা ldtax.gov.bd এবং বাড়ির জন্য সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের সেবা ব্যবহার করে ঘরে বসেই খুব সহজে হোল্ডিং নাম্বার বের করা সম্ভব। অনলাইনে সমস্যা হলে সরাসরি ভূমি অফিস বা পৌরসভায় গিয়ে অথবা ১৬১২২ নাম্বারে কল করেও এই তথ্য জানা যায়।

নিজের জমি বা বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার এখনো না জানা থাকলে, উপরের নিয়মগুলো অনুসরণ করে আজই বের করে নিন এবং সময়মতো খাজনা বা ট্যাক্স পরিশোধ করে ঝামেলামুক্ত থাকুন।

অন্যান্য পোস্টগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *