জমি কিনেছেন, কিন্তু এখনো আপনার নামে খতিয়ান হয়নি? তাহলে জেনে রাখুন, শুধু দলিল হাতে থাকলেই জমির প্রকৃত মালিক প্রমাণ করা যায় না। যতদিন না নামজারি সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন সরকারি রেকর্ডে জমিটা আগের মালিকের নামেই থেকে যায় — আর এখান থেকেই তৈরি হয় নানা আইনি জটিলতা।
সুখবর হলো, এখন আর ভূমি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় না। ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে নামজারি আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করার আগে কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং আবেদনের সঠিক নিয়ম না জানলে আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই পোস্টে ধাপে ধাপে দেখানো হলো নামজারি আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা এবং ই নামজারি আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু
নামজারি কী এবং কেন প্রয়োজন
নামজারি (মিউটেশন) হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের সরকারি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ানে আগের মালিকের নামের বদলে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জমি ক্রয়-বিক্রয়, ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্তি, দানপত্র বা আদালতের রায়ের মাধ্যমে মালিকানা হাতবদল হলে নামজারি করা বাধ্যতামূলক।
Eporcha GOV BD এর সকল সেবা dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে।
নামজারি না করলে সরকারি রেকর্ডে আপনার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না, ফলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, ব্যাংক লোন বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দলিল রেজিস্ট্রেশনের পরপরই নামজারি আবেদন করে ফেলাই সবচেয়ে নিরাপদ।
নামজারি আবেদন করতে কী কী কাগজপত্র লাগে
নামজারি আবেদন করার আগে নিচের কাগজপত্রগুলো স্ক্যান করে (jpg/png/pdf ফরম্যাটে) হাতের কাছে প্রস্তুত রাখুন। এতে আবেদন করার সময় বারবার আটকে যেতে হবে না।
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)/জন্ম নিবন্ধন সনদ/পাসপোর্টের কপি
- আবেদনকারীর সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি
- মূল দলিলের সার্টিফাইড কপি বা স্ক্যান কপি
- পূর্ববর্তী মালিকের নামীয় খতিয়ানের কপি (সিএস/এসএ/আরএস/বিএস, যেটি প্রযোজ্য)
- সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের দাখিলা (রশিদ)
- জমির প্রস্তাবিত/হাল সাল দাগ ও খতিয়ানের তথ্য
- বায়া দলিল (আগের মালিকের কাছ থেকে বর্তমান বিক্রেতা কীভাবে মালিকানা পেয়েছিলেন, তার প্রমাণ)
এই কাগজপত্রগুলো সাধারণ ক্ষেত্রে সবার জন্যই লাগে। তবে আপনি কোন সূত্রে জমির মালিকানা পেয়েছেন তার ওপর ভিত্তি করে আরও কিছু বাড়তি কাগজ যুক্ত করতে হতে পারে, যা নিচে আলাদাভাবে দেখানো হলো।
মালিকানার ধরন অনুযায়ী আলাদা কাগজপত্র
আবেদন ফরম পূরণের সময় প্রথমেই বেছে নিতে হয় আপনি কোন সূত্রে জমির মালিকানা পেয়েছেন। সূত্রভেদে বাড়তি কাগজপত্রের চাহিদা এরকম —
ক্রয়সূত্রে হলে
- সাব-কবলা দলিলের নম্বর, তারিখ ও সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম
- দলিলের সার্টিফাইড কপি
ওয়ারিশসূত্রে হলে
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা থেকে সদ্য (সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে) ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদপত্র
- মৃত ব্যক্তির (যার সম্পত্তি বণ্টন হচ্ছে) মৃত্যু সনদ
হেবা বা দানপত্রসূত্রে হলে
- হেবা দলিল বা দানপত্র দলিলের কপি
আদালতের রায় বা ডিক্রিসূত্রে হলে
- আদালতের রায়/ডিক্রির সার্টিফাইড কপি
নিলাম বা বন্দোবস্তসূত্রে হলে
- সংশ্লিষ্ট নিলাম/বন্দোবস্ত সনদের কপি
একাধিক ওয়ারিশ থাকলে বণ্টননামা বা সকলের সম্মতিপত্রও লাগতে পারে। কাগজপত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই আবেদনের আগেই সব কাগজ মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
ই নামজারি আবেদন করার নিয়ম
কাগজপত্র প্রস্তুত হয়ে গেলে নিচের ধাপ অনুসরণ করে অনলাইনে নামজারি আবেদন করতে পারবেন —
ধাপ ১ — ওয়েবসাইট ভিজিট ও অ্যাকাউন্ট তৈরি
প্রথমে land.gov.bd অথবা সরাসরি dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। প্রথমবার আবেদন করলে মোবাইল নম্বর দিয়ে নাগরিক নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) সম্পন্ন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের সময় মোবাইলে আসা ওটিপি দিয়ে যাচাই করে একটি পাসওয়ার্ড সেট করে নিতে হয়।
ধাপ ২ — লগইন করে নতুন আবেদন শুরু করুন
রেজিস্ট্রেশন করা মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। এরপর “নামজারি আবেদন” বা “ই-নামজারি আবেদন করুন” অপশনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩ — জমির অর্জনের সূত্র নির্বাচন করুন
আবেদন ফরমে প্রথমেই বেছে নিতে হবে আপনি কোন সূত্রে জমির মালিকানা পেয়েছেন — ক্রয়, ওয়ারিশ, হেবা, ডিক্রি, নিলাম বা অন্যান্য। সূত্র অনুযায়ী ফরমের বাকি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে।
ধাপ ৪ — জমির ঠিকানা ও খতিয়ান তথ্য দিন
বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর সিলেক্ট করুন। জমির পরিমাণ ও শ্রেণি সম্পর্কিত তথ্যও এখানে দিতে হবে।
ধাপ ৫ — আবেদনকারীর তথ্য পূরণ করুন
আবেদনকারীর নাম, NID নম্বর, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সঠিকভাবে লিখুন। একাধিক আবেদনকারী থাকলে (যেমন ওয়ারিশসূত্রে) সবার তথ্য যোগ করতে হবে।
ধাপ ৬ — কাগজপত্র আপলোড করুন
উপরে উল্লেখিত সব কাগজপত্রের স্ক্যান কপি পিডিএফ বা জেপিজি ফরম্যাটে নির্দিষ্ট জায়গায় আপলোড করুন। ছবি স্পষ্ট ও পরিষ্কার হওয়া জরুরি, নয়তো যাচাইয়ের সময় আবেদন আটকে যেতে পারে।
ধাপ ৭ — ফি পরিশোধ করুন
আবেদন জমা দেওয়ার আগে অনলাইনে কোর্ট ফি ২০ টাকা ও নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা মিলিয়ে মোট ৭০ টাকা বিকাশ, নগদ, রকেট বা কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
ধাপ ৮ — আবেদন সাবমিট করুন
সব তথ্য ও কাগজপত্র আরেকবার যাচাই করে “সাবমিট” বাটনে ক্লিক করুন। সফলভাবে জমা হলে একটি আবেদন আইডি (Application ID) পাবেন — এটি ভবিষ্যতে আবেদনের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য সংরক্ষণ করে রাখুন।
আবেদন করার পর করণীয়
আবেদন জমা দেওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাগজপত্র যাচাই করেন এবং প্রয়োজনে শুনানির জন্য ডাকতে পারেন। আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা যেকোনো সময় অনলাইনে যাচাই করা যায়। আবেদন অনুমোদিত হলে ডিসিআর ফি পরিশোধ করে নামজারি খতিয়ান ডাউনলোড করা যাবে। আবেদনের বর্তমান অবস্থা কীভাবে যাচাই করবেন, তার বিস্তারিত ধাপ দেখে নিতে পারেন এই পোস্টে — ই নামজারি যাচাই করার নিয়ম।
নামজারি করতে কত টাকা লাগে
নামজারি আবেদন করার সময় ও পরে ধাপে ধাপে মোট কত টাকা ফি লাগে, তার বিস্তারিত হিসাব এবং ডিসিআর ফি সংক্রান্ত সব তথ্য পাবেন এই পোস্টে — নামজারি করতে কত টাকা লাগে।
নামজারি করতে কত দিন সময় লাগে
সাধারণত নামজারি আবেদন জমা দেওয়ার পর ২৮ দিনের মধ্যে সেটি অনুমোদন বা বাতিল করার নিয়ম রয়েছে। কাগজপত্রে কোনো জটিলতা বা শুনানির প্রয়োজন না হলে এই সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। তবে ওয়ারিশ সংক্রান্ত আবেদন বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
যেসব ভুলের কারণে আবেদন বাতিল হয়
আবেদন করার সময় কিছু সাধারণ ভুলের কারণে নামজারি আবেদন আটকে যায় বা বাতিল হয়ে যায় —
- আবেদনে দেওয়া তথ্যের সাথে দলিল বা খতিয়ানের তথ্যের অমিল
- কাগজপত্রের অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ স্ক্যান কপি আপলোড করা
- ওয়ারিশ সনদে নাম বা সম্পর্কের তথ্যে গরমিল
- জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তির দাবি থাকা সত্ত্বেও তা উল্লেখ না করা
- ভূমি উন্নয়ন করের হালনাগাদ রশিদ যুক্ত না করা
আবেদন বাতিল হয়ে গেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই — নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পুনরায় আবেদন বা আপিল করার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন — নামজারি আবেদন বাতিল করার নিয়ম ও বাতিল হলে করণীয়।
আরও পড়ুন:
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
নামজারি আবেদন করতে ন্যূনতম কী কী কাগজ লাগবে?
ন্যূনতম আবেদনকারীর NID, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, মূল দলিলের কপি, পূর্ববর্তী খতিয়ানের কপি এবং সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ লাগবে। মালিকানার সূত্রভেদে আরও কিছু কাগজ বাড়তি লাগতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ কতদিনের মধ্যে ইস্যু করা লাগবে?
সাধারণত আবেদনের সময় সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদপত্র জমা দিতে হয়।
নামজারি আবেদন কি নিজে নিজে করা যায়, নাকি দলিল লেখক লাগে?
হ্যাঁ, dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে নিজে নিজেই ঘরে বসে নামজারি আবেদন করা যায়। দলিল লেখক বা দালালের সাহায্য ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।
দলিল না থাকলে কি নামজারি আবেদন করা যাবে?
না, মূল দলিল বা তার সার্টিফাইড কপি ছাড়া নামজারি আবেদন করা যায় না। দলিল হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে হবে।
একাধিক ওয়ারিশ থাকলে কীভাবে আবেদন করতে হয়?
একাধিক ওয়ারিশ থাকলে সকলের তথ্য আবেদনে যুক্ত করতে হয় এবং প্রয়োজনে বণ্টননামা বা সকলের সম্মতিপত্র সংযুক্ত করতে হয়।
আবেদন জমা দেওয়ার পর কি শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়?
সাধারণ ক্ষেত্রে অনলাইন আবেদনের কাগজপত্র ঠিক থাকলে শুনানির প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে কোনো জটিলতা বা আপত্তি উঠলে সহকারী কমিশনার শুনানির জন্য ডাকতে পারেন।
নামজারি আবেদন করতে কি ভূমি অফিসে যেতে হয়?
না, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে ঘরে বসেই সম্পন্ন করা যায়। তবে কাগজপত্রে জটিলতা থাকলে বা শুনানির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হতে পারে।
শেষ কথা
নামজারি আবেদন যত সহজ মনে হয়, কাগজপত্রে সামান্য ঘাটতি থাকলেই ততটাই ঝামেলার হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আবেদন করার আগে এই পোস্টে উল্লেখিত কাগজপত্রের তালিকা মিলিয়ে নিন এবং ধাপে ধাপে নিয়ম অনুসরণ করুন। এতে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে এবং দ্রুত সময়ে নিজের নামে জমির খতিয়ান পেয়ে যাবেন।
নামজারি ও ভূমি সংক্রান্ত আরও তথ্য জানতে ঘুরে আসুন আমাদের ওয়েবসাইটের অন্যান্য পোস্ট থেকে।





