অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার নিয়ম ২০২৬

লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে খাজনা দেওয়ার দিন শেষ। এখন ঘরে বসে মোবাইল দিয়েই মাত্র কয়েক মিনিটে অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যায়। বরং উল্টো খবর হলো—১লা বৈশাখ থেকে সরকার ম্যানুয়ালি বা সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থাৎ, আপনার জমি থাকলে অনলাইনে খাজনা পরিশোধ করাটা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক।

অনেকেই জানেন না ঠিক কোথা থেকে শুরু করবেন, কোন ওয়েবসাইটে যেতে হবে, নিবন্ধন কীভাবে করতে হয়, কিংবা বিকাশ-নগদ দিয়ে টাকা দেওয়ার সময় কোথায় ভুল হয়ে যায়। এই পোস্টে খাজনা পরিশোধ করার নিয়ম, নিবন্ধন থেকে শুরু করে দাখিলা (রশিদ) ডাউনলোড পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ছবির বদলে ধাপে ধাপে খুবই সহজ ভাষায় দেখানো হলো, যাতে প্রথমবার চেষ্টাতেই আপনার কাজ হয়ে যায়।

ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আসলে কী?

ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax বা LD Tax) হলো জমির মালিক হিসেবে সরকারকে প্রতি বছর দিতে হওয়া একটি বাধ্যতামূলক কর, যা সাধারণ মানুষের কাছে “খাজনা” নামেই বেশি পরিচিত। এই কর পরিশোধের বিনিময়ে জমির মালিক যে রশিদ পান, তাকে বলা হয় “দাখিলা”। এই দাখিলা শুধু একটি রশিদ নয়—এটি আপনার জমির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র, যা নামজারি, জমি বেচাকেনা কিংবা ব্যাংক ঋণের মতো নানা ক্ষেত্রে কাজে লাগে।

আগে উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে ম্যানুয়ালি খাজনা দিতে হতো। এখন পুরো প্রক্রিয়াটি www.ldtax.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়।

অনলাইনে খাজনা পরিশোধের আগে যা যা প্রস্তুত রাখবেন

আবেদন শুরুর আগে হাতের কাছে এই তথ্যগুলো রাখলে পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে:

  • আপনার সচল একটি মোবাইল নম্বর (OTP আসার জন্য)
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর
  • জন্ম তারিখ
  • জমির খতিয়ান নম্বর (আর এস/বি এস/সি এস, যেটি প্রযোজ্য)
  • জমির মৌজা, জে এল নম্বর ও দাগ নম্বর
  • পেমেন্টের জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট বা কার্ড

খতিয়ান নম্বর হাতে না থাকলে আগে ই পর্চা খতিয়ান অনুসন্ধান করে সেটি বের করে নিন।

ধাপ ১: ldtax.gov.bd তে নাগরিক নিবন্ধন করার নিয়ম

প্রথমবার এই পোর্টাল ব্যবহার করলে আগে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  1. যেকোনো ব্রাউজার (গুগল ক্রোম, ফায়ারফক্স) থেকে www.ldtax.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
  2. হোমপেজ থেকে “নাগরিক কর্নার” বাটনে ক্লিক করুন।
  3. “নাগরিক নিবন্ধন” অপশনে ক্লিক করুন।
  4. এবার মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিয়ে “পরবর্তী পদক্ষেপ” বাটনে ক্লিক করুন।
  5. আপনার মোবাইলে একটি OTP (ওটিপি কোড) আসবে, সেটি নির্ধারিত ঘরে বসিয়ে দিন।
  6. এরপর ৬ থেকে ৮ ডিজিটের একটি পাসওয়ার্ড সেট করুন এবং নিবন্ধন সম্পন্ন করুন।

নিবন্ধন যেকোনো সময় করা যায়, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার মধ্যেই করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

ধাপ ২: প্রোফাইল সম্পন্ন করে খতিয়ান ও হোল্ডিং তথ্য যুক্ত করা

নিবন্ধন শেষ হলে এবার লগইন করে প্রোফাইল সম্পূর্ণ করার পালা।

  1. “নাগরিক লগইন” বাটনে ক্লিক করে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করুন।
  2. প্রোফাইল সেকশনে গিয়ে বর্তমান ঠিকানা ও ইমেইল আইডি এন্ট্রি করে প্রোফাইল ১০০% সম্পন্ন করুন।
  3. “খতিয়ান” মেনুতে ক্লিক করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা ও খতিয়ানের ধরন (যেমন আর এস খতিয়ান) নির্বাচন করুন।
  4. খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর যুক্ত করে সংযুক্তি হিসেবে খতিয়ানের একটি স্ক্যান কপি আপলোড করুন।
  5. আপনার মালিকানার ধরন অনুযায়ী “নিজ” অথবা “উত্তরাধিকার” নির্বাচন করে সবুজ রঙের “সংরক্ষণ করুন” বাটনে ক্লিক করুন।

আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে জমা হবে। ভূমি অফিস যাচাই করে অনুমোদন দিলে আপনার জমির জন্য একটি হোল্ডিং নম্বর তৈরি হয়ে যাবে, যা প্রোফাইলের “হোল্ডিং” মেনুতে দেখা যাবে। হোল্ডিং নম্বর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখে নিতে পারেন হোল্ডিং নাম্বার বের করার নিয়ম সংক্রান্ত আমাদের আলাদা পোস্টটি।

হোল্ডিংয়ের কোনো তথ্য ভুল মনে হলে “বিস্তারিত” বাটনে গিয়ে “আপত্তি” অপশনে ক্লিক করে সংশোধনের আবেদন করা যায়।

ধাপ ৩: অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করার নিয়ম

হোল্ডিং নম্বর তৈরি হয়ে গেলে এবার আসল কাজ—কর পরিশোধ।

  1. প্রোফাইলে গিয়ে আপনার হোল্ডিং নির্বাচন করে “অনলাইন পেমেন্ট” বাটনে ক্লিক করুন।
  2. পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে ই-চালান অথবা সোনালী পেমেন্ট যেকোনো একটি নির্বাচন করুন।
  3. পেমেন্ট মেথড থেকে সোনালী ব্যাংক, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড অথবা মোবাইল ব্যাংকিং—যেকোনো একটি বেছে নিন।

বিকাশে খাজনা পরিশোধ করতে চাইলে:

  1. মোবাইল ব্যাংকিং অপশন থেকে bKash নির্বাচন করুন।
  2. “Pay with bKash” বাটনে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বরটি লিখুন এবং CONFIRM করুন।
  3. মোবাইলে আসা ভেরিফিকেশন কোডটি বসিয়ে আবার CONFIRM করুন।
  4. আপনার বিকাশ পিন কোড দিয়ে শেষবারের মতো CONFIRM বাটনে ক্লিক করুন।

পেমেন্ট সফল হলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার বকেয়া ও চলতি বছরের কর দেখিয়ে দেবে এবং নির্ধারিত পরিমাণ টাকা কেটে নেবে। নগদ বা রকেটের ক্ষেত্রেও একই রকম ধাপ অনুসরণ করতে হয়—শুধু bKash-এর জায়গায় নিজের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপটি নির্বাচন করলেই হবে।

দাখিলা ডাউনলোড করার নিয়ম

পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর প্রোফাইলের “দাখিলা” অপশনে গিয়ে রশিদটি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে নিন। এই দাখিলা সংরক্ষণ করা জরুরি, কারণ ভবিষ্যতে জমি বেচাকেনা, জমির মালিকানা যাচাই বা নামজারির সময় এটি প্রমাণপত্র হিসেবে চাওয়া হতে পারে। পোর্টালে সাময়িক রশিদ পাওয়ার পর প্রয়োজনে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে চূড়ান্ত দাখিলাও সংগ্রহ করে নিতে পারেন।

ভূমি উন্নয়ন করের হার ২০২৬ (কৃষি ও অকৃষি জমি)

জমির ধরন অনুযায়ী খাজনার হার ভিন্ন হয়। সাধারণ হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

জমির ধরনকর হার
কৃষি জমি (২৫ বিঘা বা ৮.২৫ একর পর্যন্ত)সম্পূর্ণ মওকুফ
কৃষি জমি (২৫ বিঘার অধিক থেকে ১০ একর পর্যন্ত)প্রতি শতাংশে ৫০ পয়সা
কৃষি জমি (১০ একরের ঊর্ধ্বে)প্রতি শতাংশে ১ টাকা
চা/রাবার/ফল/ফুলের বাগান (১ একরের বেশি)প্রতি শতাংশে ১ টাকা ১০ পয়সা
বাণিজ্যিক ও আবাসিক জমিস্থান ও শ্রেণিভেদে নির্ধারিত পৃথক হার

মনে রাখবেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশুর খামার, চা-কফি-রাবার বাগান ইত্যাদির জন্য জমি ব্যবহার করলে জমির পরিমাণ যত কমই হোক না কেন, সেই জমির পুরোটার জন্যই নির্ধারিত হারে কর দিতে হয়—এক্ষেত্রে ২৫ বিঘার মওকুফ প্রযোজ্য নয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে খাজনা মওকুফ হয়

  • ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক কৃষি জমি ২৫ বিঘা বা তার কম হলে
  • ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী (০.৫০ থেকে ২.৪৯ একর) নিজে শ্রম দিয়ে হাঁস-মুরগি বা ডেইরি খামার চালালে
  • মসজিদ, মন্দির, গির্জা, কবরস্থান, শ্মশানঘাটের জমির ক্ষেত্রে (জেলা প্রশাসকের কাছে পৃথক আবেদন সাপেক্ষে)
  • ৫টির কম হস্তচালিত তাঁতের জমি নিজে পরিচালনা করলে

খাজনা বকেয়া থাকলে কী হয়

নির্ধারিত সময়ে খাজনা পরিশোধ না করলে বকেয়া অঙ্কের ওপর বার্ষিক প্রায় ৬.২৫% হারে সুদ যোগ হতে থাকে, ফলে যত দেরি হবে, দিতে হবে তত বেশি টাকা। দীর্ঘদিন খাজনা বকেয়া থাকলে জমির মালিকানা প্রমাণ করতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে, এমনকি সরকার সংশ্লিষ্ট জমিকে খাস জমি হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে দীর্ঘমেয়াদে। তাই খতিয়ানের সাথে আগের বছরের দাখিলা যুক্ত না থাকলে সিস্টেম সর্বোচ্চ কয়েক দশকের বকেয়া কর একসাথে নির্ধারণ করে দিতে পারে—তাই প্রতি বছর নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

অনলাইনে খাজনা পরিশোধে সমস্যা হলে করণীয়

  • হোল্ডিং নম্বর এখনো তৈরি না হলে একটু অপেক্ষা করুন, স্থানীয় ভূমি অফিস যাচাই শেষে তা এন্ট্রি করে।
  • পেমেন্ট আটকে গেলে বা টাকা কেটে নিলেও রশিদ না এলে ১৬১২২ নম্বরে কল করে ভূমি সেবা হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।
  • ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে বা প্রক্রিয়াটি জটিল মনে হলে নিকটস্থ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) থেকেও সহায়তা নেওয়া যায়।
  • বেশি সমস্যা মনে হলে সরাসরি www.land.gov.bd সেবা পোর্টাল থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা যায়।

সংশ্লিষ্ট আরও কিছু বিষয়

খাজনা পরিশোধের সাথে জমির অন্যান্য কাগজপত্রও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের বিস্তারিত পোস্ট রয়েছে:

শেষ কথা

অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করা এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ, শুধু নিয়মটা জানা থাকা দরকার। নিবন্ধন, খতিয়ান-হোল্ডিং যুক্ত করা এবং মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে পেমেন্ট—এই তিনটি ধাপ ঠিকমতো অনুসরণ করলে বাড়িতে বসেই কাজটি শেষ করা সম্ভব। প্রতি বছর নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে দাখিলা সংরক্ষণ করে রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে নামজারি বা জমি বেচাকেনার সময় কোনো ঝামেলায় পড়তে না হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

অনলাইনে খাজনা পরিশোধ করার ওয়েবসাইট কোনটি?

অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে হয় www.ldtax.gov.bd এই সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে।

খাজনা দিতে কি সরাসরি ভূমি অফিসে যাওয়া লাগবে?

সাধারণত লাগে না। নিবন্ধন, খতিয়ান যুক্ত করা ও পেমেন্ট—পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনেই সম্পন্ন করা যায়। তবে কোনো তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে ভূমি অফিস যোগাযোগ করতে পারে।

বিকাশ দিয়ে কি খাজনা পরিশোধ করা যায়?

হ্যাঁ, বিকাশ, নগদ, রকেট বা যেকোনো ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ldtax.gov.bd পোর্টাল থেকে খাজনা পরিশোধ করা যায়।

হোল্ডিং নম্বর ছাড়া কি খাজনা দেওয়া যাবে?

না, খাজনা পরিশোধ করতে হলে আগে খতিয়ানের তথ্য দিয়ে ভূমি অফিস থেকে অনুমোদিত হোল্ডিং নম্বর থাকা প্রয়োজন।

খাজনার রশিদকে কী বলা হয়?

খাজনা পরিশোধের পর যে রশিদ পাওয়া যায় তাকে “দাখিলা” বলা হয়, যা জমির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র।

কত বিঘা কৃষি জমি পর্যন্ত খাজনা লাগে না?

একক বা পারিবারিকভাবে ২৫ বিঘা (৮.২৫ একর) পর্যন্ত কৃষি জমির জন্য কোনো ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয় না।

খাজনা বাকি থাকলে কী সমস্যা হতে পারে?

বকেয়া খাজনার ওপর বার্ষিক সুদ যোগ হতে থাকে এবং দীর্ঘদিন বকেয়া থাকলে মালিকানা প্রমাণ ও নামজারিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সর্বোচ্চ কত বছরের খাজনা একসাথে অগ্রিম দেওয়া যায়?

সর্বোচ্চ তিন বছরের খাজনা অগ্রিম পরিশোধ করা যায়।

খাজনা পরিশোধে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করবো?

ভূমি সেবা সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় ১৬১২২ নম্বরে কল করা যায় অথবা নিকটস্থ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) থেকে সহায়তা নেওয়া যায়।

অন্যান্য পোস্টগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *