পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন বা ওয়ারিশদের মাঝে সম্পত্তি ভাগাভাগি আমাদের সমাজের একটি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। তবে অনেকেই জানেন না যে, “মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব” ঠিক কীভাবে করতে হয়। বিশেষ করে পিতা-মাতার অবর্তমানে ভাই-বোন, স্ত্রী বা অন্যান্য আত্মীয়রা কে কতটুকু অংশ পাবেন, তা নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি বা বিবাদ দেখা যায়।
আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মকানুন, বিভিন্ন ওয়ারিশদের অংশ এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু
মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ আইন কী?
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন, যা ফারায়েজ আইন নামেও পরিচিত, মূলত পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক একজন মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট হারে বণ্টন করার যে বিজ্ঞান বা জ্ঞান, তাকেই ফারায়েজ বলা হয়। বাংলাদেশে “Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937” এবং “মুসলিম পারিবারিক আইন-১৯৬১” এর আলোকে মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন করা হয়ে থাকে।
সম্পত্তি বণ্টনের আগে জরুরি ৩টি কাজ
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি সরাসরি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার আগে অবশ্যই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে হবে:
- দাফন-কাফনের খরচ: মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের যাবতীয় খরচ তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে মেটাতে হবে।
- ঋণ পরিশোধ: মৃত ব্যক্তির যদি কোনো দেনা বা ঋণ থাকে (যেমন: ব্যাংক ঋণ, পাওনাদার, বা স্ত্রীর দেনমোহর), তা অবশ্যই আগে পরিশোধ করতে হবে।
- উইল বা ওসিয়ত কার্যকর: মৃত ব্যক্তি যদি তার সম্পদের কোনো অংশের ব্যাপারে উইল বা ওসিয়ত করে যান, তবে তা কার্যকর করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনোভাবেই মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) বেশি উইল করা যায় না।
এই তিনটি ধাপ সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট যে সম্পত্তি থাকবে, কেবল সেটিই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারীদের শ্রেণিবিভাগ
উত্তরাধিকারীদের মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. অংশীদার বা কোরানিক ওয়ারিশ: যাদের অংশ কুরআনে নির্দিষ্ট করে বলা আছে। এই শ্রেণিতে মোট ১২ জন ব্যক্তি রয়েছেন (৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন নারী)। যেমন: পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, কন্যা, আপন বোন ইত্যাদি।
২. অবশিষ্টাংশভোগী বা আসাবা: অংশীদারদের তাদের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পর যদি কোনো সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে, তবে তা এই শ্রেণির ওয়ারিশরা পেয়ে থাকেন। সাধারণত পুত্র, পৌত্র বা ভাই এই শ্রেণিতে পড়েন।
৩. দূরবর্তী আত্মীয়: যদি প্রথম দুই শ্রেণির কোনো ওয়ারিশ জীবিত না থাকেন, কেবল তখনই এই শ্রেণির আত্মীয়রা সম্পত্তির অধিকার পান।
বিভিন্ন ওয়ারিশের সম্পত্তির হিসাব
চলুন জেনে নিই, প্রধান প্রধান ওয়ারিশরা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ঠিক কতটুকু অংশ পেয়ে থাকেন:
স্বামীর সম্পত্তির হিসাব
মৃত স্ত্রীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে, তবে স্বামী মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ বা চার ভাগের এক ভাগ পাবেন। মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ বা অর্ধেক পাবেন।
স্ত্রীর সম্পত্তির হিসাব
মৃত স্বামীর সন্তান থাকলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ বা আট ভাগের এক ভাগ পাবেন। (একাধিক স্ত্রী থাকলেও তারা এই ১/৮ অংশ নিজেদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে নেবেন)। স্বামীর কোনো সন্তান না থাকলে স্ত্রী পাবেন সম্পত্তির ১/৪ অংশ।
পিতার সম্পত্তির হিসাব
মৃত ব্যক্তির পিতা তিন অবস্থায় সম্পত্তি পেতে পারেন। পুত্র বা পৌত্র থাকলে পিতা পাবেন মোট সম্পত্তির ১/৬ অংশ। শুধু কন্যা সন্তান থাকলে পিতা নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে ১/৬ অংশ পাবেন এবং বাকি অংশীদারদের দেওয়ার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবে আসাবা হিসেবে সেটিও পাবেন।
কোনো সন্তান না থাকলে অন্য ওয়ারিশদের দেওয়ার পর বাকি পুরো সম্পত্তি পিতা আসাবা হিসেবে পাবেন।
মাতার সম্পত্তির হিসাব
সন্তান বা একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা পাবেন সম্পত্তির ১/৬ অংশ। সন্তান বা ভাই-বোন না থাকলে মাতা পাবেন সম্পত্তির ১/৩ অংশ। (বিশেষ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তির ১/৩ অংশ মাতা পান)।
ছেলে ও মেয়ের সম্পত্তির হিসাব
মুসলিম আইনে পুত্র ও কন্যার সম্পত্তির অনুপাত সাধারণত ২:১ হয়ে থাকে।
ছেলে ও মেয়ে উভয়েই থাকলে: ছেলে যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবে, মেয়ে তার অর্ধেক পাবে (অর্থাৎ, ২ জন মেয়ের সমান অংশ ১ জন ছেলে পাবে)।
শুধু একটি মেয়ে থাকলে: যদি মৃত ব্যক্তির কোনো পুত্র না থাকে এবং কেবল একজন মেয়ে থাকে, তবে সে মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।
একাধিক মেয়ে থাকলে (পুত্র ছাড়া): কন্যা যদি একাধিক হয় এবং কোনো পুত্র না থাকে, তবে কন্যারা সবাই মিলে সম্পত্তির ২/৩ অংশ পাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুসলিম আইনে কোনো সন্তানকে ত্যাজ্য করার নিয়ম নেই, তাই কোনো ওয়ারিশকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
সম্পত্তি বণ্টনে নতুন নিয়ম
বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র মৌখিকভাবে সম্পত্তি ভাগ করে নিলেই তা আইনি ভিত্তি পায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে একটি বণ্টননামা দলিল তৈরি করে তা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই রেজিস্ট্রিকৃত দলিল ছাড়া ওয়ারিশরা নিজেদের নামে জমির নামজারি বা মিউটেশন করতে পারবেন না এবং জমিও বিক্রি করতে পারবেন না।
সম্পত্তি নিয়ে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা
সম্পত্তি নিয়ে সমাজে বেশ কিছু সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী যেসব ধারণা ঠিক নয় এবং সম্পত্তি ভাগ-বণ্টনের সময় এগুলো ভুল ধারণা হিসেবেই প্রমাণিত হয়। এমন কিছু সাধারণ ভুল ধারণা নিম্নবর্ণিত –
- সৎ ছেলে-মেয়ে: মুসলিম আইন অনুযায়ী সৎ পিতা-মাতা বা সৎ ছেলে-মেয়েরা একে অপরের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না।
- দত্তক সন্তান: পালিত বা দত্তক সন্তান সরাসরি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পায় না, তবে চাইলে তাদের নামে সম্পদের ১/৩ অংশ পর্যন্ত উইল করা যায়।
- মৃত সন্তানের অধিকার: যদি পিতার জীবদ্দশায় কোনো পুত্র বা কন্যা মারা যায়, তবে মৃত পুত্র/কন্যার সন্তানেরা (অর্থাৎ নাতি-নাতনিরা) তাদের দাদার সম্পত্তিতে ঠিক ততটুকুই অংশ পাবে, যতটুকু তাদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেত।
শেষ কথা
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব কিছুটা জটিল মনে হলেও, এর নিয়মগুলো অত্যন্ত নিখুঁত। সমাজে অনেক সময়ই অজ্ঞতার কারণে নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে বা সম্পত্তির সঠিক হিসাব বের করতে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী বা ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন।





