আপনার জমির খাজনা কয়েক বছর ধরে দেওয়া হয়নি, অথচ কত টাকা বাকি পড়ে আছে তা জানা নেই? কিংবা জমি কিনেছেন সদ্য, কিন্তু বুঝতে পারছেন না খাজনা বছরে ঠিক কত টাকা গুনতে হবে? দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন ভূমি অফিসে না গিয়েই, ঘরে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে কয়েক মিনিটেই জমির খাজনার পুরো হিসাব বের করা যায়।
এই পোস্টে জমির খাজনা বাকি আছে কিনা চেক করার নিয়ম, খাজনা বের করার সহজ পদ্ধতি এবং বছরে কত টাকা খাজনা দিতে হয়—এই তিনটি বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু
খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর আসলে কী
গ্রামীণ ভাষায় যেটাকে আমরা “খাজনা” বলি, সরকারি ভাষায় সেটাই ভূমি উন্নয়ন কর (Land Development Tax)। জমির মালিক হিসেবে প্রতি বছর সরকারকে এই কর পরিশোধ করতে হয়। খাজনা পরিশোধ করলে যে রশিদ পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় দাখিলা—আর এই দাখিলাই জমির মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করে। নামজারি, জমি বিক্রি বা ব্যাংক লোনের ক্ষেত্রেও প্রায়ই হালনাগাদ দাখিলা চাওয়া হয়।
আগে খাজনা সংক্রান্ত এই আইনটি পরিচিত ছিল Land Development Tax Ordinance, 1976 নামে। বর্তমানে এটি হালনাগাদ হয়ে ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এই আইন অনুযায়ী কর বছর গণনা করা হয় প্রতি বছরের ১লা জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০শে জুন পর্যন্ত।
জমির খাজনা বাকি আছে কিনা কীভাবে চেক করবেন
খাজনা বাকি আছে কিনা জানার জন্য এখন আর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দৌড়াতে হয়না। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল পোর্টাল ldtax.gov.bd থেকেই ঘরে বসে পুরো তথ্য জানা যায়।
চেক করার জন্য যা যা প্রয়োজন হবে:
- জমির বিভাগ, জেলা ও উপজেলা/থানার নাম
- মৌজার নাম বা জে এল (J.L.) নম্বর
- হোল্ডিং নম্বর অথবা খতিয়ান ও দাগ নম্বর
ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো—
- প্রথমে ব্রাউজারে গিয়ে ldtax.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
- হোমপেজ থেকে “পেমেন্ট করুন” অপশনে ক্লিক করুন।
- বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং মৌজা সিলেক্ট করুন।
- হোল্ডিং নম্বর দিয়ে “অনুসন্ধান” বাটনে ক্লিক করুন।
- এবার স্ক্রিনে জমির যাবতীয় তথ্য—কতদিনের কর বকেয়া আছে, কত টাকা বাকি, আগের পরিশোধের ইতিহাস—সবকিছু দেখা যাবে।
হোল্ডিং নম্বর হাতের কাছে না থাকলে খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর দিয়েও অনুসন্ধান করা যায়। কোনো কারণে অনলাইনে তথ্য না মিললে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করলেও একই তথ্য জানা যাবে।
জমির খাজনা বের করার নিয়ম
শুধু বাকি আছে কিনা চেক করাই নয়, চাইলে খাজনা অনলাইনেই পরিশোধ করে ফেলা যায়। এজন্য প্রথমে একবার নাগরিক নিবন্ধন করে নিতে হয়। নিচে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে দেওয়া হলো—
ধাপ ১: নাগরিক নিবন্ধন করুন
- ldtax.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে “নাগরিক কর্নার” থেকে “নাগরিক নিবন্ধন” অপশনে ক্লিক করুন।
- মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিয়ে “পরবর্তী পদক্ষেপ” এ ক্লিক করুন।
- মোবাইলে আসা OTP কোডটি বসিয়ে যাচাই করুন।
- একটি পাসওয়ার্ড সেট করুন—এই মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়েই পরবর্তীতে লগইন করা যাবে।
ধাপ ২: প্রোফাইল সম্পূর্ণ করুন
নিবন্ধনের পর লগইন করে প্রোফাইলে বর্তমান ঠিকানা ও ইমেইল যোগ করুন। প্রোফাইল ১০০% পূরণ না হলে পরবর্তী ধাপে সমস্যা হতে পারে।
ধাপ ৩: খতিয়ান/হোল্ডিং যুক্ত করুন
প্রোফাইলে ঢুকে জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর দিয়ে হোল্ডিং যুক্ত করুন। এই তথ্য যাচাই হয়ে হোল্ডিং “অনুমোদিত” দেখালে বুঝবেন পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
ধাপ ৪: বকেয়ার তথ্য দেখুন ও পেমেন্ট করুন
হোল্ডিংয়ে ক্লিক করলে কত টাকা বকেয়া আছে তা দেখা যাবে। “অনলাইন পেমেন্ট” বাটনে ক্লিক করে বিকাশ, রকেট, নগদ বা কার্ডের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করুন এবং পিন দিয়ে নিশ্চিত করুন।
ধাপ ৫: দাখিলা সংগ্রহ করুন
পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর দাখিলা সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদিত হয়ে যায়। এরপর প্রোফাইলের “দাখিলা” অপশন থেকে রশিদটি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে রাখতে পারবেন।
মৃত ব্যক্তির নামে খাজনা নিবন্ধন বা পরিশোধ করা যায় না। এক্ষেত্রে আগে ওয়ারিশদের নামে নামজারি সম্পন্ন করে নিতে হবে। নামজারি সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়া জানতে পড়ুন—নামজারি খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম।
জমির খাজনা বছরে কত টাকা
খাজনার পরিমাণ নির্ভর করে জমিটি কৃষি নাকি অকৃষি (আবাসিক/বাণিজ্যিক) এবং জমির পরিমাণের ওপর।
কৃষি জমির খাজনা
- একজন ব্যক্তি বা পরিবারের ৮.২৫ একর (২৫ বিঘা) পর্যন্ত কৃষি জমির জন্য কোনো খাজনা দিতে হয় না—এই পরিমাণ জমি সম্পূর্ণভাবে কর মওকুফের আওতাভুক্ত।
- তবে মওকুফের আওতায় থাকলেও প্রতিটি হোল্ডিংয়ের জন্য বছরে ১০ টাকা বাধ্যতামূলক দাখিলা ফি দিতে হয়।
- ২৫ বিঘার বেশি কৃষি জমি থাকলে জমির পরিমাণ অনুযায়ী হার প্রযোজ্য হয়—২ একর পর্যন্ত শতাংশপ্রতি প্রায় ৩ পয়সা, ২ থেকে ৫ একর পর্যন্ত শতাংশপ্রতি ৩০ পয়সা, ৫ থেকে ১০ একর পর্যন্ত শতাংশপ্রতি ৫০ পয়সা এবং ১০ একরের বেশি হলে শতাংশপ্রতি ২ টাকা হারে কর দিতে হয়।
- চা, কফি, রাবার, ফুল-ফলের বাগান কিংবা বাণিজ্যিকভাবে মাছ/চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি বা গবাদি পশুর খামারের জমির ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ যতই হোক না কেন, পুরো জমির জন্য শতাংশপ্রতি ২ টাকা হারে কর প্রযোজ্য হবে।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক জমির খাজনা
অকৃষি (আবাসিক/বাণিজ্যিক) জমির খাজনার হার নির্ধারিত হয় এলাকাভেদে—অর্থাৎ জমিটি সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা নাকি ইউনিয়ন এলাকায় পড়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। সাধারণভাবে—
- ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হার সবচেয়ে বেশি।
- রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তুলনামূলক কম।
- জেলা শহরের পৌরসভা ও অন্যান্য পৌর এলাকায় আরও কম।
- ইউনিয়ন/গ্রাম এলাকার জমির জন্য হার সবচেয়ে কম।
যেহেতু প্রতিটি এলাকার জন্য নির্দিষ্ট হার সরকারি গেজেটে আলাদাভাবে নির্ধারিত এবং সময়ে সময়ে হালনাগাদ হয়, তাই আপনার জমির সঠিক ও হালনাগাদ খাজনার হার জানতে ldtax.gov.bd-তে হোল্ডিং যুক্ত করে দেখাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়, অথবা স্থানীয় ইউনিয়ন/উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিতে পারেন।
খাজনা বকেয়া থাকলে কত জরিমানা যোগ হয়
নিয়মিত সময়ে খাজনা দিলে কোনো সুদ বা জরিমানা গুনতে হয় না। কিন্তু একাদিক্রমে ৩ বছর খাজনা বকেয়া থাকলে, প্রথম বছর থেকেই বকেয়া করের ওপর বছরে ৬.২৫% হারে জরিমানা যোগ হতে থাকে। যতদিন বকেয়া থাকবে, ততই এই সুদ চক্রবৃদ্ধি আকারে মূল করের সাথে যুক্ত হবে। তাই দীর্ঘদিন খাজনা বাকি রাখলে শেষ পর্যন্ত পরিশোধযোগ্য মোট অঙ্কটা মূল করের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।
খাজনা না দিলে কী সমস্যা হতে পারে
খাজনা দীর্ঘদিন বকেয়া রাখলে জরিমানা ছাড়াও আরও কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে:
- একাদিক্রমে ৩ বছর বকেয়া থাকলে Public Demands Recovery Act, 1913 অনুযায়ী সার্টিফিকেট মামলা রুজু করে বকেয়া আদায় করার সুযোগ রাখা হয়েছে আইনে।
- হালনাগাদ দাখিলা না থাকলে নামজারি, জমি বিক্রি বা ব্যাংক লোনের সময় জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
- জমির মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে নিয়মিত খাজনা পরিশোধের রেকর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাই ঝামেলা এড়াতে প্রতি বছর নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
খাজনা কাকে বলে?
জমির মালিক হিসেবে সরকারকে প্রতি বছর যে কর দিতে হয়, তাকেই সাধারণ ভাষায় খাজনা বলা হয়। সরকারি পরিভাষায় এটি ভূমি উন্নয়ন কর নামে পরিচিত।
কত বিঘা জমি পর্যন্ত খাজনা লাগে না?
একজন ব্যক্তি বা পরিবারের ৮.২৫ একর বা ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির জন্য কোনো খাজনা দিতে হয় না, তবে বছরে ১০ টাকা দাখিলা ফি দিতে হয়।
খাজনা কত বছরের অগ্রিম দেওয়া যায়?
সর্বোচ্চ তিন বছরের অগ্রিম ভূমি উন্নয়ন কর একসাথে পরিশোধ করা যায়।
হোল্ডিং নম্বর না জানলে খাজনা চেক করা যাবে কি?
হোল্ডিং নম্বর না থাকলেও খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর দিয়ে ldtax.gov.bd ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করে খাজনার তথ্য বের করা যায়।
একই হোল্ডিংয়ে একাধিক ধরনের জমি (কৃষি, আবাসিক) থাকলে কি আলাদা দাখিলা লাগবে?
না। একই হোল্ডিংয়ে কৃষি, বাণিজ্যিক, আবাসিক ইত্যাদি একাধিক শ্রেণির জমি থাকলেও একটি হোল্ডিংয়ের জন্য একটিমাত্র দাখিলাই যথেষ্ট।
মৃত ব্যক্তির নামে খাজনা পরিশোধ করা যায় কি?
না, মৃত ব্যক্তির নামে খাজনা নিবন্ধন বা পরিশোধ করা যায় না। এক্ষেত্রে আগে ওয়ারিশদের নামে নামজারি সম্পন্ন করে নিতে হবে।
খাজনা রশিদ বা দাখিলা হারিয়ে গেলে কী করব?
ldtax.gov.bd-তে প্রোফাইলে লগইন করে দাখিলা অপশন থেকে আগের পরিশোধিত দাখিলার কপি আবার ডাউনলোড করে নেওয়া যায়।
সারকথা
জমির খাজনা বাকি আছে কিনা চেক করা, খাজনা বের করা এবং বছরে কত টাকা খাজনা দিতে হয়—এই তিনটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এই পোস্টে শেয়ার করা হয়েছে। সংক্ষেপে বললে, ldtax.gov.bd ওয়েবসাইটে হোল্ডিং নম্বর বা খতিয়ান নম্বর দিয়ে সহজেই বকেয়ার তথ্য জানা যায় এবং একবার নাগরিক নিবন্ধন করে নিলে ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ করে দাখিলা সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রতি বছর নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করলে জরিমানা গোনার প্রয়োজন হয়না এবং জমির মালিকানা সংক্রান্ত ঝামেলাও এড়ানো যায়।
ভূমি সংক্রান্ত আরও তথ্য জানতে আমাদের ওয়েবসাইট ঘুরে দেখুন।





