বাবা বা মায়ের মৃত্যুর পর জমি এখনো তার নামেই রয়ে গেছে, কিন্তু বুঝতে পারছেন না কীভাবে নিজের নামে আনবেন? এই সমস্যায় প্রতি বছর লাখো মানুষ পড়েন। ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি যতদিন না নামজারি করা হয়, ততদিন সরকারি রেকর্ডে সেটা মৃত ব্যক্তির নামেই থেকে যায় — ফলে জমি বিক্রি, ব্যাংক লোন কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধেও ঝামেলা তৈরি হয়।
স্বস্তির বিষয় হলো, ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ এবং পুরোপুরি অনলাইনে করা যায়। তবে ক্রয়সূত্রের নামজারির চেয়ে এখানে কিছু বাড়তি ধাপ ও কাগজপত্র লাগে, যা না জানলে আবেদন বারবার আটকে যেতে পারে। এই পোস্টে ধাপে ধাপে দেখানো হলো ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার সম্পূর্ণ নিয়ম।
এই পোস্টের বিষয়বস্তু
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি কী
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া জমি স্বাভাবিকভাবেই তার আইনগত উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশদের নামে বণ্টিত হয়। এই বণ্টনকে সরকারি ভূমি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির নামের বদলে ওয়ারিশদের নাম খতিয়ানে যুক্ত করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি বা ওয়ারিশ খারিজ।
Eporcha GOV BD এর সকল সেবা dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে।
ক্রয়সূত্রে নামজারির সাথে এর মূল পার্থক্য হলো — এখানে কোনো বিক্রয় দলিল থাকে না, বরং উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কে কতটুকু অংশ পাবেন তা নির্ধারণ করাই মূল কাজ। মুসলিম ও হিন্দু পরিবারে উত্তরাধিকার বণ্টনের নিয়ম আলাদা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন আমাদের আগের পোস্ট — মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব।
ওয়ারিশ সনদ কী এবং কীভাবে সংগ্রহ করবেন
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হলো ওয়ারিশ সনদ। এটি এমন একটি সরকারি সনদ, যেখানে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের নাম, সম্পর্ক ও সংখ্যা উল্লেখ থাকে। সাধারণত এই সনদ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ইস্যু করা হয়।
আগে ওয়ারিশ সনদ পেতে ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি গিয়ে আবেদন করতে হতো, তবে এখন prottoy.gov.bd (জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন ব্যবস্থা) ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও অনলাইনে ওয়ারিশ সনদের আবেদন করা যাচ্ছে। ধাপগুলো মূলত এরকম —
- prottoy.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে নাগরিক অ্যাকাউন্ট খুলুন বা লগইন করুন।
- “ওয়ারিশ সনদ” সেবাটি নির্বাচন করুন।
- মৃত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা ও মৃত্যুর তারিখ লিখুন।
- সকল ওয়ারিশের নাম, জন্ম তারিখ ও সম্পর্ক উল্লেখ করে আবেদন জমা দিন।
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা যাচাই করে সনদ অনুমোদন করলে তা ডাউনলোড করা যাবে।
নামজারি আবেদনের সময় সাধারণত সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হয়, তাই নামজারি আবেদনের ঠিক আগে সনদটি সংগ্রহ করাই ভালো।
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করতে কী কী কাগজপত্র লাগে
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি আবেদনের সাথে নিচের কাগজপত্রগুলো স্ক্যান করে (jpg/png/pdf ফরম্যাটে) আপলোড করতে হয় —
- মৃত ব্যক্তির (জমির রেকর্ডীয় মালিক) মৃত্যু নিবন্ধন সনদের কপি
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত হালনাগাদ ওয়ারিশ সনদপত্র
- মৃত ব্যক্তির নামীয় খতিয়ানের কপি (সিএস/এসএ/আরএস/বিএস)
- আবেদনকারী (ওয়ারিশ)-এর জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন সনদ
- আবেদনকারীর সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি
- সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের দাখিলা
- একাধিক ওয়ারিশ নিজেদের মধ্যে অংশ ভাগ করে নিলে বণ্টননামা দলিল (যদি থাকে)
মৃত ব্যক্তির আগের কোনো ওয়ারিশও (যেমন দাদা-দাদি) যদি ততদিনে মারা গিয়ে থাকেন এবং সম্পত্তি এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে এসে থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপের ওয়ারিশ সনদ আলাদাভাবে সংগ্রহ করে জমা দিতে হয় — এটি অনেকেই জানেন না এবং এই কারণেই আবেদন প্রায়ই আটকে যায়।
বণ্টননামা ছাড়াই কি ওয়ারিশ নামজারি করা যায়
হ্যাঁ, বণ্টননামা দলিল না থাকলেও ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সকল ওয়ারিশের নাম উল্লেখ করে যৌথ মালিকানা হিসেবে নামজারি করা যায়, অর্থাৎ প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ অনুপাত অনুযায়ী একই খতিয়ানে সবার নাম যুক্ত হবে। পরবর্তীতে কেউ চাইলে নিজের অংশ আলাদা করে নামজারি (বণ্টনভিত্তিক নামজারি) করাতে পারবেন।
তবে যদি ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে নিতে চান এবং প্রত্যেকে আলাদা দাগে বা অংশে নিজের নামে নামজারি করাতে চান, তাহলে অবশ্যই একটি বণ্টননামা দলিল বা সকল ওয়ারিশের স্বাক্ষরযুক্ত সম্মতিপত্র থাকা প্রয়োজন। নয়তো ভূমি অফিস একতরফাভাবে কোনো একজনের নামে নির্দিষ্ট অংশ নামজারি করে দেবে না, কারণ এতে অন্য ওয়ারিশদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি আবেদন করার নিয়ম
কাগজপত্র প্রস্তুত হয়ে গেলে নিচের ধাপ অনুসরণ করে অনলাইনে ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি আবেদন করতে পারবেন —
ধাপ ১ — ওয়েবসাইটে লগইন করুন
dlrms.land.gov.bd বা land.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। নতুন হলে প্রথমে মোবাইল নম্বর দিয়ে নাগরিক নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিন।
ধাপ ২ — নতুন নামজারি আবেদন শুরু করুন
“নামজারি আবেদন করুন” অপশনে ক্লিক করে নতুন আবেদন ফরম ওপেন করুন।
ধাপ ৩ — অর্জনের সূত্র হিসেবে “ওয়ারিশ” নির্বাচন করুন
জমি অর্জনের সূত্র জিজ্ঞাসা করা হলে তালিকা থেকে “ওয়ারিশ সূত্রে” অপশনটি বেছে নিন। এতে ফরমে মৃত ব্যক্তি ও ওয়ারিশ সংক্রান্ত বাড়তি ঘর যুক্ত হয়ে যাবে।
ধাপ ৪ — মৃত ব্যক্তি ও জমির তথ্য দিন
মৃত ব্যক্তির নাম, মৃত্যুর তারিখ এবং তার নামীয় খতিয়ান, দাগ ও মৌজার তথ্য পূরণ করুন।
ধাপ ৫ — সকল ওয়ারিশের তথ্য যোগ করুন
প্রত্যেক ওয়ারিশের নাম, NID নম্বর, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর আলাদা আলাদাভাবে যুক্ত করুন। যিনি আবেদন করছেন, তার তথ্য প্রধান আবেদনকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ধাপ ৬ — কাগজপত্র আপলোড করুন
মৃত্যু নিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশ সনদ, পূর্বের খতিয়ানের কপি, NID ও খাজনার রশিদ নির্দিষ্ট জায়গায় আপলোড করুন। প্রতিটি ফাইল স্পষ্ট ও পড়ার উপযোগী হতে হবে।
ধাপ ৭ — ফি পরিশোধ করুন
অনলাইনে কোর্ট ফি ২০ টাকা ও নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা মিলিয়ে মোট ৭০ টাকা বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
ধাপ ৮ — আবেদন সাবমিট করুন
সব তথ্য যাচাই করে আবেদন সাবমিট করুন। সফলভাবে জমা হলে একটি আবেদন আইডি পাবেন, যা দিয়ে পরবর্তীতে আবেদনের অবস্থা যাচাই করতে পারবেন — সেই নিয়ম জানতে পড়ুন ই নামজারি যাচাই করার নিয়ম।
একাধিক ওয়ারিশ থাকলে করণীয়
একাধিক ওয়ারিশ থাকলে সবার সম্মতি নিয়েই আবেদন করা উচিত। কেউ প্রবাসে থাকলে তার পক্ষ থেকে সম্মতিপত্র বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংগ্রহ করে রাখা ভালো। কোনো ওয়ারিশ নাবালক হলে তার পক্ষে আইনগত অভিভাবকের তথ্য উল্লেখ করতে হয়। এছাড়া কোনো ওয়ারিশের নাম ওয়ারিশ সনদে বাদ পড়ে গেলে বা ভুল থাকলে নামজারি আবেদন করার আগেই সেটি সংশোধন করিয়ে নেওয়া উচিত, নয়তো পরবর্তীতে আবেদন বাতিল বা মিস কেসের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।
- নামজারি খতিয়ান অনুসন্ধান করার নিয়ম
- জমির মালিকানা যাচাই করার নিয়ম
- নামজারি আবেদন বাতিল করার নিয়ম ও বাতিল হলে করণীয়
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করতে কত টাকা ও কত দিন লাগে
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারির ফি ক্রয়সূত্রের নামজারির মতোই — আবেদনের সময় কোর্ট ফি ও নোটিশ জারি ফি মিলিয়ে ৭০ টাকা এবং অনুমোদনের পর ডিসিআর ফি বাবদ আরও কিছু টাকা লাগে। সম্পূর্ণ ফি এর বিস্তারিত হিসাব জানতে পড়ুন — নামজারি করতে কত টাকা লাগে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত ২৮ দিনের মধ্যে অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। তবে একাধিক ওয়ারিশ বা কাগজপত্রে জটিলতা থাকলে শুনানির প্রয়োজন হতে পারে, ফলে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।
যেসব কারণে ওয়ারিশ নামজারি আবেদন আটকে যায়
- ওয়ারিশ সনদে সব ওয়ারিশের নাম উল্লেখ না থাকা বা তথ্যে ভুল থাকা
- মৃত্যু নিবন্ধন সনদ না থাকা বা পুরনো/অস্পষ্ট কপি জমা দেওয়া
- একাধিক ধাপের উত্তরাধিকার হলে মাঝের ধাপের ওয়ারিশ সনদ বাদ পড়া
- ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বা আপত্তি থাকা
- ভূমি উন্নয়ন করের হালনাগাদ রশিদ যুক্ত না করা
এমন কোনো সমস্যায় আবেদন বাতিল হয়ে গেলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবার আবেদন বা আপিল করা যায়, যার বিস্তারিত পাবেন আমাদের নামজারি আবেদন বাতিল করার নিয়ম পোস্টে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ওয়ারিশ সনদ ছাড়া কি নামজারি করা যায়?
না, ওয়ারিশ সূত্রে নামজারির জন্য বৈধ ওয়ারিশ সনদ বাধ্যতামূলক। এটি ছাড়া ভূমি অফিস আবেদন গ্রহণ করবে না।
ওয়ারিশ সনদ কতদিনের মধ্যে ইস্যু করা হতে হবে?
সাধারণত আবেদনের সময় সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে ইস্যুকৃত ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হয়।
সব ওয়ারিশ একসাথে না গিয়ে কি একজন একা নামজারি আবেদন করতে পারেন?
হ্যাঁ, একজন ওয়ারিশ সব ওয়ারিশের নাম উল্লেখ করে যৌথ মালিকানা হিসেবে আবেদন করতে পারেন। তবে কারও একক নামে নির্দিষ্ট অংশ নামজারি করতে হলে বণ্টননামা বা সম্মতিপত্র লাগবে।
নাবালক ওয়ারিশ থাকলে কীভাবে আবেদন করতে হয়?
নাবালক ওয়ারিশের পক্ষে তার আইনগত অভিভাবকের তথ্য উল্লেখ করে আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।
কোনো ওয়ারিশ প্রবাসে থাকলে কী করতে হবে?
প্রবাসী ওয়ারিশের পক্ষ থেকে সম্মতিপত্র বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সংগ্রহ করে আবেদনের সাথে যুক্ত করলেই আবেদন করা যাবে।
মৃত ব্যক্তির খতিয়ান খুঁজে না পেলে কী করব?
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করে পুরনো খতিয়ানের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, অথবা dlrms.land.gov.bd ওয়েবসাইটে খতিয়ান অনুসন্ধান করে দেখতে হবে।
ওয়ারিশ নামজারিতে কি শুনানিতে সবাইকে উপস্থিত থাকতে হয়?
কাগজপত্র সঠিক থাকলে ও কোনো আপত্তি না উঠলে শুনানির প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে ওয়ারিশদের মধ্যে দ্বিমত বা আপত্তি থাকলে সহকারী কমিশনার সংশ্লিষ্টদের শুনানির জন্য ডাকতে পারেন।
শেষ কথা
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি অনেকের কাছেই জটিল মনে হয়, কারণ এখানে একাধিক ব্যক্তির তথ্য ও সম্মতি জড়িত থাকে। তবে সঠিক ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটি ঘরে বসেই অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব। আবেদনের আগে এই পোস্টে উল্লেখিত ধাপ ও কাগজপত্রের তালিকা মিলিয়ে নিলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
ভূমি ও নামজারি সংক্রান্ত আরও তথ্য জানতে ঘুরে আসুন আমাদের ওয়েবসাইটের অন্যান্য পোস্ট থেকে।





